FAQs on Joining the Ramakrishna Order (Bengali)

external


Read in  English  | हिंदी  |   தமிழ்  |  తెలుగు  |  മലയാളം  |  ଓଡ଼ିଆ  |  ગુજરાતી  |  मराठी  |  ಕನ್ನಡ  |  অসমীয়া  


শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে তরুণদের অনেকেই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে সন্ন্যাসজীবন অবলম্বনের জন্য আগ্রহী হন। কেউ কেউ আবার নানা মাধ্যমে বেদান্ত বিষয়ক বক্তৃতা বা আলোচনা শুনে সংসার ত্যাগ করতে উৎসাহ বোধ করেন। জাগতিক প্রাপ্তি এবং সম্পর্কের প্রতি মোহভঙ্গের কারণেও অনেকে এখানে এসে মানসিক শান্তি খোঁজেন। কেউ কেউ স্বভাবগতভাবেই পরার্থপর এবং সহানুভূতিশীল—তাঁরা রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের কাজ দেখে মুগ্ধ হন এবং সঙ্ঘের সেবামূলক কাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চান। কারণ যাই হোক না কেন, রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগদানের পূর্বে কয়েকটি বিষয় সচেতনভাবে বিবেচনা করা উচিত। সঙ্ঘের ভাবী সন্ন্যাসীরা যাতে মীমাংসা দ্বারা সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন, সেই উদ্দেশে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিষয় এখানে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলোচিত হলো।

১. রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ কী?

সঙ্ঘ বলতে এখানে একত্রে বসবাসকারী সন্ন্যাসীদল, যাঁদের উদ্দেশ্য এবং অনুরাগ অভিন্ন। সুনির্দিষ্ট এই সন্ন্যাসীসম্প্রদায়ের উদ্ভব শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর পার্ষদদের অনুপ্রেরণায়, যাঁদের পুরোধা ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। এখানে শ্রীমা সারদাদেবীর কথা উল্লেখ করা বিশেষভাবে আবশ্যক, যিনি আধ্যাত্মিক মর্যাদায় শ্রীরামকৃষ্ণের সমান—সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার আদিকাল থেকে তিন দশকের বেশি সময় মাতৃস্নেহ এবং আধ্যাত্মিক পরিচর্যায়  যিনি সঙ্ঘ পরিচালনা করেছেন, তিনি সঙ্ঘজননী—তিনি শ্রীমা। বাস্তবিক অর্থে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ বলতে দুটি প্রতিষ্ঠান বোঝায়—‘রামকৃষ্ণ মঠ’ ও ‘রামকৃষ্ণ মিশন’। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই প্রধান কার্যালয় হলো বেলুড় মঠ। বিশ্বজুড়ে এই প্রতিষ্ঠানের শাখাকেন্দ্র রয়েছে দুশোটিরও বেশি। দুটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, আদর্শ এবং কার্যাবলি বিশদে জানতে হলে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের সাহায্য নিতে পারেন।

২. রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে ‘যোগদান’ বলতে কী বোঝায়?

রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগদানের অর্থ নিজের পরিবার-পরিজন, জাগতিক বাসনা, বৃত্তি ও প্রাপ্তি, আনন্দ-উদ্বেগ—সবকিছু ত্যাগ করে সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহণ করা। যোগদানের পর সেই ব্যক্তি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের কোনো মঠ বা আশ্রমে থাকবেন। নিজের জীবন উৎসর্গ করবেন শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনা এবং নিঃস্বার্থ সেবায়।

৩. রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য আবশ্যিক শর্ত কী কী?

আগ্রহী পুরুষদের মধ্যে যাঁরা স্নাতক এবং যাঁদের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে, তাঁরা রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগদানের উপযুক্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিকেল শাখার স্নাতক, কিংবা স্নাতকোত্তরদের জন্য বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৩০ বছর, পাশ্চাত্যের নাগরিকদের  ক্ষেত্রে এই বয়সসীমা ৩৬ বছর। আরও বিস্তারিত তথ্য পেতে পারেন বেলুড় মঠের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে: mail@rkmm.org।

৪. সন্ন্যাসজীবনে আগ্রহী তরুণীদের জন্য কি কোনো ব্যবস্থা আছে?

রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে শুধুমাত্র পুরুষেরা সন্ন্যাসী হতে পারেন। মহিলাদের জন্য ‘শ্রী সারদা মঠ’ নামে একটি সমান্তরাল সঙ্ঘ আছে, যা অভিন্ন আদর্শ অনুসরণ করে। আগ্রহী তরুণীরা সরাসরি কলকাতার দক্ষিণেশ্বরে অবস্থিত সারদা মঠের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন : saradamath.office@srvmm.org।

৫. আমি একজন বিবাহিত পুরুষ, আমি কি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যুক্ত হতে পারি?

দুঃখিত, শুধুমাত্র অবিবাহিত পুরুষেরাই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগ দিতে পারেন। পূর্বে বিবাহ করেছিলেন, এখন বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে—এমন ব্যক্তিরাও বিবেচিত হবেন না। তবে ভক্ত বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আপনি সর্বদাই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এ ব্যাপারে আপনার নিকটবর্তী শাখাকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে পারেন।

৬. যে ব্যক্তি সর্বত্যাগী হতে চলেছেন, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিচার্য কেন?

যদিও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা পূর্বশর্ত নয়, তবু নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য তা প্রয়োজন :

ক) সন্ন্যাসগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য পরিণত মনের নির্দিষ্ট বিচক্ষণতা প্রয়োজন। অন্য অনেক কিছুর মতোই, সাধারণভাবে বলা যায়, প্রথাগত শিক্ষা মনকে পরিণত করতে সহায়ক।

(খ) রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সন্ন্যাসীদের জনসেবার কাজে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হয়। তাছাড়া, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয় বক্তৃতার দেওয়ার জন্য। যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা এই বিষয়গুলি সম্পাদনের অনুকূল।

(গ) অনেকের ক্ষেত্রে সাধু হওয়া হতাশা কিংবা ব্যর্থতার শেষ অবলম্বন। হয়তো তাঁরা পাঠ্যাভ্যাস এবং পরীক্ষাপদ্ধতিতে ভয় পান। হয়তো তাঁদের পরীক্ষার ফল ভালো হয়নি, বা অন্য কোনো যোগ্যতার ঘাটতির জন্য নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বয়সসীমা বিচার্য হলে, অনেক অবাঞ্ছিত সন্ন্যাসপ্রার্থীকে শুরুতেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

৭. আমি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এখনই সঙ্ঘে দিতে পারি?

আমরা বিশেষভাবে আপনার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিই, বর্তমান পাঠ্যক্রমটি শেষ করুন। পড়াশোনা শেষ করবার পরেও আপনি সঙ্ঘে যোগ দিতে পারেন। আপনার ত্যাগের মনোভাবের কারণে প্রথমেই আপনার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটুক, তা আমরা চাই না। পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি আমাদের যেকোনো শাখাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। অবসর সময়ে সেখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবেও কাজ করতে পারেন।

৮. সঙ্ঘে যোগদানের পরেও আমি কি কলেজের পড়াশোনা বা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারি?

সাধারণত, প্রার্থীরা সঙ্ঘে যোগদানের পূর্বেই তাঁদের প্রথাগত শিক্ষা শেষ করবেন, এটিই প্রত্যাশিত।

৯. আমার কয়েকটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে। সঙ্ঘে যোগদানের পথে কি তা অন্তরায়?

প্রার্থীর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সাধুরা অন্যের সেবা করবেন—সেটিই কাম্য, ফলে সঙ্ঘে যোগদানের শর্ত হিসাবে প্রার্থীদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হয়, এবং তা আবশ্যিক। দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্ষয়কারী কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে সঙ্ঘে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয় না। কারণ, শারীরিক অসুস্থতার জন্য তাঁরা সন্ন্যাসজীবনের কঠোরতা পালন করতে পারবেন না।

১০. শ্রীরামকৃষ্ণ বা স্বামী বিবেকানন্দের উপর কোনো বই এখনও পড়া হয়নি। আমি কি সঙ্ঘে যোগ দিতে পারি?

আপনার এখনই যোগদান করা ঠিক হবে না। সঙ্ঘে যোগদানের আগে শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সাহিত্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই অবশ্যই পড়ে নিন।

১১. আমি গভীরভাবে বেদান্ত অধ্যয়নে আগ্রহী। সঙ্ঘে যোগ দিয়ে তা সম্ভব কি?

অবশ্যই সম্ভব। ভগবদ্গীতা এবং উপনিষদের মতো বৈদান্তিক ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ সঙ্ঘে রয়েছে। যোগদানের প্রায় তিন বছর পর প্রতিটি শিক্ষানবিশকে আমাদের বিদ্যায়তন—বেলুড় মঠের প্রবেশনার্স ট্রেনিং সেন্টারে দু-বছরের কঠিন এবং উচ্চমানের পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করতে হয়। এখানে পড়ানো হয় বেদান্ত-সহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় বিষয়। শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা সারদাদেবী, স্বামী বিবেকানন্দ এবং অপরাপর পার্ষদের জীবন ও উপদেশাবলি এক অর্থে বেদান্ত। কারণ তাঁরা বেদান্তের সত্য উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁদের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাঁদের অনুসরণ করে, আমাদের সঙ্ঘের সন্ন্যাসীরা শুধুমাত্র পাণ্ডিত্যের জন্য নয়, বরং শাস্ত্রীয় সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এবং অবিচল বিশ্বাসের জন্য ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে সঙ্ঘজীবন—দিনযাপনের ধরন এমনভাবে সুনির্দিষ্ট যে, তা সন্ন্যাসী এবং শিক্ষানবিশ, সকলেরই আধ্যাত্মিক বিকাশের সহায়ক।

১২. জন্মসূত্রে হিন্দু নন, এমন ব্যক্তিও কি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগ দিতে পারেন?

এটা কোনো সমস্যা নয়। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ সকল ধর্ম, জাতি এবং সম্প্রদায়ের জন্যই উন্মুক্ত। তবে তাঁদের ত্যাগের বিশুদ্ধ জীবন যাপন করতে হবে এবং শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। যেমন, সকল ধর্মপথে একই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, বা জীবসেবাই ঈশ্বরসেবা প্রভৃতি।

১৩. আমি কৃষ্ণ, শিব, কালী, খ্রিস্ট বা অন্য কোনো দেবতার ভক্ত। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগ দিতে পারব?

আপনাকে স্বাগত! যদি আপনি শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁর উপদেশগুলির প্রতি অবিচল আস্থাবান হন, তবে অবশ্যই সঙ্ঘে যোগ দিতে পারেন।

১৪. আমি কি দেশের দরিদ্র এবং আর্তের সেবাকাজে সঙ্ঘে যোগ দিতে পারি?

নিজের সেবাদর্শকে বিস্তৃত করতে ইচ্ছুক হলে নিশ্চয়ই তা পারেন। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ অন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। আমাদের নীতি এবং কর্মপন্থা স্থির করে দিয়েছেন স্বয়ং স্বামীজী—আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ, অর্থাৎ জগতের কল্যাণসাধনে নিজের মুক্তি। আধ্যাত্মিকতা সঙ্ঘের ভিত্তি, চালিকাশক্তি এবং অন্তিম লক্ষ্য। আমাদের সন্ন্যাসীরা সেবাকর্মকে তাঁদের সাধনার একটি পন্থা হিসাবে বিবেচনা করেন। এই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র সহানুভূতির মনোভাব বা দেশপ্রেমের চেতনা নয়, সঙ্ঘজীবনে তা অপরিহার্য।

১৫. আমি সন্ন্যাসী হতে চাই। কিন্তু মা-বাবা বিরুদ্ধ মত পোষণ করেন। আমার কী করা উচিত?

সঙ্ঘে যোগদানের জন্য মা-বাবার সম্মতি কাম্য, কিন্তু তা অপরিহার্য নয়। কারণ আপনি প্রাপ্তবয়স্ক। খুব কম ক্ষেত্রেই মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে সন্ন্যাস গ্রহণে উৎসাহ দেন। অনেক ক্ষেত্রেই সন্ন্যাস-প্রার্থীকে সংসারত্যাগের ইচ্ছার কারণে মা-বাবার বিরোধিতা, এমনকী ক্রোধেরও সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু কেউ যদি অন্তর থেকে নিশ্চিত হন যে পার্থিব আনন্দের প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে এই জীবন বেছে নিচ্ছেন, সাংসারিক কোনো দায়িত্ব এড়ানোর জন্য নয়, তাহলে কোনো কিছুই আপনার সামনে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। একই সঙ্গে এ-ও সত্য যে, কয়েকবছর পর, অধিকাংশ মা-বাবা রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে তাঁদের সন্তানের যোগদানের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন এবং অনেকে এজন্য গর্ববোধও করেন। সন্ন্যাসধর্ম শাস্ত্রসমর্থিত অতি প্রাচীন এক রীতি—বিরোধিতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ইচ্ছুক প্রার্থীর অন্তরে এই অনুভব থাকা উচিত। জাবালোপনিষদে বলা হয়েছে, অন্তরে প্রেরণা অনুভূত হওয়ামাত্র সংসার ত্যাগ করা উচিত।

১৬. সঙ্ঘে যোগ দিয়ে আমি মা-বাবা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারি?

প্রাথমিক পর্যায়ে এক শিক্ষানবিশ তাঁর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে, প্রয়োজনে তাঁদের শারীরিক কুশলাদির খোঁজ নিতে পারেন। কিন্তু পূর্বাশ্রমের সমস্ত সম্পর্কই একজন সন্ন্যাসীর কাছে পরিতাজ্য। সকলেই রাতারাতি এই অনাসক্তি অর্জন করতে পারেন না। তাই যত শীঘ্র সম্ভব জাগতিক সম্পর্কগুলি দূরে সরিয়ে রেখে অনাসক্তির অনুশীলন প্রয়োজন।

১৭. আমার নামে কিছু বিষয়সম্পত্তি আছে। সঙ্ঘে যোগ দিলে এগুলির কী হবে?

সংজ্ঞানুযায়ী, সন্ন্যাসী ব্যক্তিগতভাবে সম্পত্তির মালিক হতে পারেন না। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ এবং আইনের ব্যাখ্যা উভয়ই এই বিষয়ে সহমত। সঙ্ঘে যোগদানের পূর্বেই বা যোগদানের পর যত শীঘ্র সম্ভব, নিজের ইচ্ছানুযায়ী আপনার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করুন।

১৮. সঙ্ঘে আমি কি কোনো বেতন পাব?

রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে সন্ন্যাসীদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না, কারণ এটি সন্ন্যাস-আদর্শের পরিপন্থী। সন্ন্যাসজীবন বেতনের আশায় চাকরি করা নয়। এখানে বস্তুগত কোনো লাভের প্রত্যাশা না রেখে স্বেচ্ছায়, সম্পূর্ণরূপে দেহ, মন, প্রতিভা এবং শ্রম দান করতে হয়।

১৯. সঙ্ঘে যোগদানের পর ব্যক্তিগত প্রয়োজনগুলি কে পূরণ করবেন? বৃদ্ধবয়সে কে দেখাশোনা করবেন?

সন্ন্যাসজীবনের অর্থ সবকিছুর জন্য ঠাকুরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা। একইভাবে, সঙ্ঘই আপনার দায়িত্ব নেবেন এবং সর্ববিষয়ে সহায়তা করবেন। এ বিষয়ে দুশ্চিন্তার কোনো প্রয়োজন নেই।

২০. সঙ্ঘে যোগদানের পর আমার কেমন পোশাক পরা উচিত?

সঙ্ঘের সদস্যরা সাধারণত কুর্তা, ধুতি এবং উত্তরীয় ব্যবহার করেন। ব্রহ্মচারীদের পোশাকের রং সাদা, সন্ন্যাসীদের পরিহিত পোশাক গেরুয়া রঙের।

২১. যোগদানের পর পূর্ণ সন্ন্যাসী হতে কতদিন সময় লাগে?

সাধারণভাবে ন্যূনতম নয় বছর। সন্ন্যাসব্রত গ্রহণের পূর্বে প্রার্থী যাতে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন, তার জন্য এই সময় দেওয়া হয়। সন্ন্যাসীসম্প্রদায়ে অন্তর্ভুক্তির পর আপনার নতুন সন্ন্যাসনাম হবে—নামের পূর্বে যুক্ত হবে ‘স্বামী’ এবং অন্তে ‘আনন্দ’।

২২. সঙ্ঘে যোগদানের পর সঙ্ঘ আমার কাছে কী প্রত্যাশা করবে?

সঙ্ঘে যোগদানের পর দুটি আদর্শ পালনে আপনাকে জীবন উৎসর্গ করতে হবে : আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ— জগতের হিতসাধনে নিজের মুক্তি। অর্থাৎ সঙ্ঘজীবনে আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং নিঃস্বার্থ সেবায় আপনাকে মগ্ন থাকতে হবে। আধ্যাত্মিক অনুশীলন বলতে জপ, ধ্যান, প্রার্থনা, পূজা, স্তোত্রপাঠ, ভক্তিগীতি, শাস্ত্রাধ্যয়ন এবং সাধনজীবনের আনুষঙ্গিক অন্য বিষয়। এইগুলির মধ্যে জপ এবং ধ্যানের দৈনন্দিন অনুশীলন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে কিছু আপনি এককভাবে করবেন, বাকিগুলি আশ্রমের অন্য সন্ন্যাসীভাইদের সঙ্গে মিলিতভাবে। পাশাপাশি সমান উৎসাহ এবং আন্তরিকতার সঙ্গে নিঃস্বার্থ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করবেন—এইভাবেই সঙ্ঘের সেবাধর্মে আপনার ভূমিকা পালিত হবে। মঠের কাজ করুন বা বৃহত্তর জনসেবা—আশা করা হবে আপনি তা উপাসনার মনোভাব নিয়ে করবেন, যাতে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সাধনপথ হয়ে ওঠে আপনার কর্ম। এইপ্রকার দিনযাপনে পবিত্রতা, ভক্তি, বিরাগ, নিঃস্বার্থতা, সত্যবাদিতার মতো সাধুর গুণাবলি ক্রমে  ক্রমে আপনি অর্জন করবেন, পালন করবেন ব্রহ্মচর্য—উপলব্ধি করবেন ঈশ্বরকে।

২৩. রামকৃষ্ণ-পরম্পরায় আধ্যাত্মিক সাধনার পদ্ধতি কী?

রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, রাজযোগ এবং জ্ঞানযোগ—এই চারপ্রকার যোগের সমন্বয় সাধিত হয়েছে। এই চার যোগের সম্মিলন ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের অনুকূল। প্রকৃতপক্ষে, যদি কেউ অবিচল প্রত্যয়ে সঙ্ঘজীবন  অনুসরণ এবং অনুশীলন করেন, তবে তিনি তাঁর জীবনে এই চারটি যোগকে কার্যত সহজেই সমন্বিত করতে পারবেন। স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক পরিকল্পিত সঙ্ঘ-প্রতীকে চারটি যোগের সামঞ্জস্য সুন্দরভাবে চিত্রিত। আমাদের প্রতীকটির ব্যাখা রয়েছে এখানে : ??

২৪. ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে আরও জানতে চাই। কোনো নির্দেশিকা বা উপযুক্ত গ্রন্থপাঠের পরামর্শ দেবেন?

বিভিন্ন উৎস থেকে সংকলিত ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের উপদেশ এখানে পড়া যাবে : ??

এ ছাড়াও, এই দুটি বই পাঠ করলে আপনি প্রয়োজনীয়  নির্দেশ পেতে পারেন স্বামী শ্রীকান্তানন্দ রচিত ‘Youth! Arise Awake and Know Your Strength’ গ্রন্থের ‘ব্রহ্মচর্যের শক্তি’ সম্পর্কিত অধ্যায়ে এবং স্বামী অশোকানন্দ লিখিত ‘Spiritual Practice’ গ্রন্থের ‘ব্রহ্মচর্য’ বিষয়ক অধ্যায়ে।

২৫. সঙ্ঘে যোগদানের পর আধ্যাত্মিক সহায়তার জন্য কোনো শিক্ষক থাকেন?

নিশ্চয় থাকেন। সঙ্ঘের প্রবীণ সাধুদের কাছে গেলে তাঁরা সন্ন্যাসজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনাকে পরামর্শ দেবেন। এছাড়া, আপনি সঠিক পথে আছেন কিনা দেখার জন্য তাঁরাও আপনার উপর দৃষ্টি রাখবেন।

২৬. আমি এখনও দীক্ষাপ্রাপ্ত নই। আমার কী করা উচিত?

অধ্যাত্মপথের জন্য মন্ত্রদীক্ষা একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ও বিধিসম্মত অনুষ্ঠান, গুরু তাঁর শিষ্যকে ইষ্টনাম প্রদান করেন। গুরু মন্ত্রদীক্ষার সময় ধ্যানজপের পদ্ধতিও শিখিয়ে দেন। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে মন্ত্রদীক্ষা দেন পূজনীয় সঙ্ঘাধ্যক্ষ এবং পূজনীয় সহ-সঙ্ঘাধ্যক্ষ। আপনি যদি তাঁদের কারও কাছ থেকে মন্ত্রদীক্ষা না পেয়ে থাকেন, তাহলে সঙ্ঘে যোগদানের অনতিবিলম্বে সেই মন্ত্রদীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

২৭. আমি সঙ্ঘের যেকোনো শাখায় যোগ দিতে পারি?

কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের সকল শাখাকেন্দ্রে, এমনকী অন্য দেশেও, শিক্ষানবিশদের অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা আছে। আপনি বেলুড় মঠেও যোগ দিতে পারেন। নতুনদের জন্য বেলুড় মঠে প্রি-প্রবেশনার্স ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। তবে যে কেন্দ্রেই যোগ দিন না কেন, আপনি বেলুড় মঠের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দু-বছর সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন।

২৮. বেলুড় মঠে যোগদানের বিশেষত্ব কী?

বেলুড় মঠ হলো রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের কেন্দ্রস্থল, প্রধান মঠও এখানে। এই মঠ স্বামী বিবেকানন্দ এবং বেশ কয়েকজন শ্রীরামকৃষ্ণ পার্ষদের স্মৃতিধন্য, তাঁরা এখানে থেকেছেন। সঙ্ঘের প্রধান কার্যালয়ও বেলুড় মঠ। এইসব পূত অনুষঙ্গের কারণে অনেকেই বেলুড় মঠে তাঁদের সঙ্ঘজীবন শুরু করতে চান। প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শিক্ষানবিশদের ছয় থেকে বারো মাস অবধি থাকতে হয়। এরপর এখান থেকেই তাঁদের দেশ-বিদেশের নানা শাখাকেন্দ্রে পাঠানো হয়।

২৯. আমার কাছাকাছি এলাকায় একটি রামকৃষ্ণ আশ্রম আছে। আমি কি সেখানে যোগ দিতে পারি?

আশ্রমের নামে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ’ বা ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ যুক্ত থাকলেই  সেই আশ্রম আমাদের শাখাকেন্দ্র, এমনটা না-ও হতে পারে। তাই যোগদানের পূর্বে আপনি যে আশ্রমের কথা বলছেন তা আমাদের স্বীকৃত শাখা কিনা যাচাই করে নিন। আমাদের শাখাকেন্দ্রগুলির তালিকা বেলুড় মঠের ওয়েবসাইটে [belurmath.org] দেওয়া আছে।

৩০. একটি বিশেষ শাখাকেন্দ্র যদি আমার পছন্দ হয়, তবে আমি কি বাকি জীবন সেখানে সন্ন্যাসী হিসাবে থাকতে পারি?

আপনি সঙ্ঘে যোগ দিতে পারবেন সেই শাখায়, সর্বাধিক তিন বছর সেখানে থাকতেও পারবেন।  কিন্তু এরপর, বেলুড় মঠের  অগ্রজ সাধুদের উপর নির্ভর করবে সঙ্ঘের কোন্ শাখাকেন্দ্রে আপনাকে পাঠানো হবে। পছন্দের কোনো শাখাকেন্দ্রে বাকি জীবন কাটানোর অভিলাষ সন্ন্যাসমননের পরিপন্থী। পছন্দের কেন্দ্রে যোগ দিয়ে সর্বাধিক তিন বছর কাটানোর পর বেলুড় মঠের প্রবীণ সন্ন্যাসীদের বিবেচনা অনুযায়ী পৃথিবীর যেকোনো শাখাকেন্দ্রে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।

৩১. বিদেশে ধর্মপ্রচারের সুযোগ পেতে পারি কি?

পেতে পারেন, আবার না-ও পেতে পারেন। বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে প্রধান কার্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন কাকে বিদেশে পাঠানো হবে। সঙ্ঘে যোগদানের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম হবে, যদি আপনি ঈশ্বরের কাছে আত্মসমপর্ণের মনোভাবটি ধরে রাখতে পারেন এবং অপরাপর প্রবল ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অর্থাৎ বাসনা পরিহার করতে পারেন।

৩২. সুনির্দিষ্টভাবে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ এবং সাধারণভাবে সন্ন্যাসধর্ম সম্পর্কে জানতে হলে কী কী বই পড়া দরকার?

রামকৃষ্ণ-বেদান্ত সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলি পড়ার প্রস্তাব আগেই দিয়েছি। এর সঙ্গে আরও দুটি বই পড়তে পারেন : স্বামী ভজনানন্দ লিখিত ‘The Glory of Monastic Life’ এবং বেদান্ত কেশরী সংকলন ‘Monasticism‒Ideal and Traditions’।

৩৩. ধরা যাক, আমি সঙ্ঘজীবন মানিয়ে নিতে পারলাম না। সেক্ষেত্রে সঙ্ঘ ত্যাগ করতে পারব?

হ্যাঁ। সন্ন্যাসজীবনের যেকোনো পর্যায়ে আপনি সঙ্ঘ ত্যাগ করতে পারেন। প্রার্থীরা স্ব-ইচ্ছায় সঙ্ঘে যোগ দেন, আবার সঙ্ঘ ত্যাগের ক্ষেত্রেও আপনার ইচ্ছাই প্রধান। সঙ্ঘ ত্যাগের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষেরই কোনো আইনি বা আর্থিক বাধ্যবাধকতা নেই! সঙ্ঘ ত্যাগের অর্থ এই নয় যে, আপনার আধ্যাত্মিক সাধনার পরিসমাপ্তি। অন্যত্র অবস্থানকালেও আপনার সাধনা অব্যাহত থাকতে পারে।

৩৪. সব জিজ্ঞাসারই উত্তর পেলাম, তবুও নিশ্চিত হতে পারছি না—সঙ্ঘে যোগ দেব, নাকি সংসারে থেকে সাধারণ জীবনযাপন করব। এ বিষয়ে কোনো সাহায্য করতে পারেন?

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে। অন্তরাত্মায় কোন্ প্রবৃত্তি গভীরতর, তা মনোবীক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে হবে নিজেকেই। ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করুন যাতে আপনার মন অচঞ্চল এবং প্রত্যয়ী হয়। আপনি অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে অবশ্যই আলোচনা করতে পারেন, এবং তাঁদের উপদেশও বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনার অন্তরের অন্তস্থলেই জাগরূক হওয়া উচিত।